Monday , May 21 2018
Breaking News

‘মা, আমার হাত কই?’

আমার হাত কই’- আট বছরের শিশু সুমি খাতুনের প্রশ্নে কেবলই কেঁদে চলছেন মা মরিয়ম বেগম। আর সে দৃশ্য দেখে উপস্থিত সবার চোখে জল। সে জল মুছার চেষ্টা করতেও দেখা গেছে।

বুধবার (২৫ এপ্রিল) বগুড়ার শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে এই দৃশ্য দেখে নিজেকেও সামলে রাখা কঠিন হয়েছে। হাসপাতালের আসা মানুষরা তাকে দেখতে এসে সমবেদনা জানিয়ে যাচ্ছেন।

রবিবার ট্রাকচাপায় পিষ্ট হয়ে হাত হারানো সুমির অস্ত্রোপচারের পর তার জ্ঞান ফিরেছে। আর একটু পর পর কেটে ফেলা হাতের দিকে তাকিয়ে মেয়েটি তার মাকে বলছে, ‘মা, আমার হাত কই?’, ‘মা আমার হাত কই?’।

কী জবাব দেবেন মা মরিয়ম বেগম? তিনি কেবল কেঁদেই চলেছেন।

কষ্টের সংসার মরিয়ম বেগমের। সুমির বাবা উপার্জন করেন ভ্যান চালিয়ে। মাসখানেক আগে তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়েন। ভ্যানের প্যাডেলে আর পা রাখতে পারেন না। পরের বাড়িতে কাজই এখন দুই বেলা ভাত জোগাড়ের একমাত্র ভরসা।

সুমির মা শোকে পাথর হয়ে চোখ দুটো বড় বড় করে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। মেয়ের মাথার পাশে সারাক্ষণ বসে বসে থাকেন তিনি আর ভাবেন তার আদরের সন্তানটির পরিণতির কথা।

সুমির বাবা দুলাল মিয়ার সঙ্গে হাসপাতালে দেখা হয়েছিল মঙ্গলবার রাতেই। তিনিও হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। মেয়ের পরিণতি কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না তিনি।

দুলাল মিয়া কেঁদে কেঁদে বললেন, ‘আমি ওর কষ্ট দেইখে রাতে ঘুমাতে পারি না। খাবারও পেটে ঢুকে না। কী করব কূল খুঁজে পাছি না।’

স্থানীয় সাংবাদিক আবদুল ওয়াহেদ ফকির ঘটনার দিন শুরু থেকেই হাসপাতালে সুমিকে ভর্তির বিষয়ে সহযোগিতা করেছেন। তাৎক্ষণিকভাবে টাকা পয়সা দিয়েও সহায়তা করেছেন তিনি। অন্য আরও কয়েকজনের কাছে সহযোগিতা নিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর সুমির জন্য পোশাক কিনে এনেছেন।

ওয়াহেদ বলেন, ‘মেয়েটার উন্নত চিকিৎসার জন্য মোটা অংকের টাকা প্রয়োজন। কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি তার উন্নত চিকিৎসার জন্য হাত বাড়াতে পারেন। আমাদের দেশে এবং দেশের বাইরে অনেক মানুষ আছেন, যারা সুমির পাশে দাঁড়িয়ে ওর জীবন বাঁচাতে সাহায্য করতে পারেন। সুমির বাবা করজোড়ে অনুরোধ করছেন তার মেয়ের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে।’

সুমির ছোট চাচি পারুল বেগম জানান, সুমির মা মানসিকভাবে অনেকটাই বিপর্যস্ত। মানুষের বাসায় কাজ করে থাকেন। ওর বাবারও বয়স হয়েছে। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত তিনিও। আগে ভ্যান চালাতেন। এখন সেই কাজও করতে পারে না। সুমির মায়ের কাজের উপরেই ওদের দুই বেলা খাওয়া চলে। এমন পরিস্থিতিতে সুমিকে নিয়ে তারা ভেঙে পরেছে। কী করবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না।

হাসপাতালের উপাধ্যক্ষ রেজাউল আলম জুয়েল জানান, ‘সুমির অবস্থা এখন আগের চেয়ে একটু ভালো। ওর জন্য হাসপাতাল থেকে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে।’

রবিবার দুপুর দেড়টায় জেলার শেরপুর উপজেলার শেরুয়া বাজার থেকে মহাসড়ক ধরে হেঁটে বাড়িতে যাচ্ছিলেন মরিয়ম বেগম। মায়ের হাতে হাত ধরে পথ চলছিল সুমি। কিছু দূর গিয়ে মহাসড়ক আড়াআড়িভাবে পার হয়ে অন্য রাস্তায় যেতে হবে তাদের। এ সময় কন্যাকে কোলে তুলে নেন মরিয়ম। কিন্তু নিরাপদে পৌঁছতে পারেননি।

রাস্তায় পড়ে থাকা একটি পাথরে হোঁচট লেগে দুই জনই রাস্তায় পড়ে যান। এ সময় দ্রুতগতির একটি ট্রাক সুমির বাম হাতের উপর দিয়ে চলে যায়। ঘটনাস্থলেই হাত ছিঁড়ে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

স্থানীয়রা সুমিকে উদ্ধার করে প্রথমে ওই এলাকার দুবলাগাড়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে পাঠানো হয় বগুড়া শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

সূত্র-ঢাকা টাইমস