Wednesday , December 19 2018
Breaking News

দরজা বন্ধ করে গভীর ঘুমে সেবিকারা অত:পর

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে পদে পদে গুনতে হয় বকশিশের নামে টাকা। বকশিশ না দিলে কাউকে খুশিও করা যায় না আবার কোনো কাজও আদায় করা যায় না। প্রতি বিভাগের প্রতি ওয়ার্ড ঘিরে রয়েছে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট চক্র। তাদের ছাড়া সেবা পাওয়া দুষ্কর।

হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়, পরিচ্ছন্নকর্মী, স্পেশাল বয়, আয়া রোগী জিম্মি করে টাকা আদায় করে। অভিযোগ আছে রোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন কৌশলে আদায়কৃত টাকার ভাগ পান ওয়ার্ড মাস্টাররা।

তাই তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে তেমন কোনো লাভ হয় না রোগী ও স্বজনদের। নামে বিনামূল্য চিকিৎসাসেবা দেয়া হলেও সাধারণ রোগীদের গুনতে হয় টাকা। এমনকি বিনামূল্যের সিট পেতে টাকা দিতে হয়। নতুবা রোগীদের ওয়ার্ডের কোনো সিটের নিচে ও বারান্দার চলাফেরার রাস্তায় পড়ে থাকতে হয়। যদি কোনো মুমূর্ষু রোগী হয় তাও তাদের মন গলে না।

২৩ জানুয়ারি নোয়াখালীর সুধারাম থেকে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন রিকশাচালক মো. জামাল মিয়ার শিশুকন্যা হাসনা বেগম। গাছ থেকে পড়ে ব্যথা পাওয়ায় চিকিৎসক তাকে দীর্ঘমেয়াদি সেবা নিতে বলেন। হাসনার নানী আমেনা খাতুন বলেন, জরুরি বিভাগ থেকে ট্রলি দিয়ে হাসনাকে দ্বিতীয় তলায় আনতে স্পেশাল বয়দের দিয়েছেন ৪০০ টাকা। তারপর ওয়ার্ডে এসে কোনো সিট না থাকায় তাদের ঝামেলায় পড়তে হয়। ওয়ার্ডের কর্তৃপক্ষের কাছে অনেক দৌড়াদৌড়ি করে তিনি কোনো সিটের ব্যবস্থা করতে পারেননি। পরে ওয়ার্ডে লিপি নামের এক আয়াকে ৬০০ টাকা দিলে সিটের ব্যবস্থা হয়ে যায়।

আমেনা বলেন, শুধু তাই নয়- হাসনাকে পরীক্ষা নিরীক্ষা, অটি, ডেসিং করাতে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতে স্পেশাল বয়, আয়াসহ অনেককে প্রায় ২ হাজার টাকা বকশিশ দিতে হয়েছে। এই ওয়ার্ডের মাস্টার মো. রিয়াজ উদ্দিনের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি। অভিযোগের বিষয়ে জানিয়ে ভালো করেছেন। দু’দিন আমাকে সময় দেন। এর মধ্যে আমি সব কিছু অন্তত ৮০ শতাংশ ঠিক করে নেব।

৮ই এপ্রিলের ঘটনা। ঢামেকের নতুন ভবনের ৫ম তলার মেডিসিন বিভাগের ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডে (মহিলা) ভর্তি দেয়া হয় ভোলার তজমুউদ্দিনের মিলন বিবিকে (৫০)। তার ভাই আবদুল মতিন তাকে ঢামেকে নিয়ে আসেন। কিন্তু ওই ওয়ার্ডে তার বোনের জন্য তিনি কোনো সিটের ব্যবস্থা করতে পারেননি। ওয়ার্ড বয়, আয়ারা সেদিন কোনো সিট নেই বলে জানান। পরে ওই ওয়ার্ডের এক রোগীর স্বজনের পরামর্শে সেখানকার একজনকে ২০০ টাকা দিয়ে একটি সিটের ব্যবস্থা করেন।

মিলন বিবির ভাই আবদুল মতিন বলেন, হাসপাতালে প্রবেশের পর চিকিৎসা শুরুর আগেই অনেককে টাকা দিয়েছি। এখানে টাকা ছাড়া কেউ ভালোভাবে কথাও বলে না। আবার টাকা দিলে সব কিছু ঠিকঠাক মতো হয়ে যায়। কিন্তু আমরা গরিব মানুষ। তাদেরকে খুশি করে সেবা নেয়ার মতো আমাদের এত টাকা নেই। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডের মাস্টার আবুল হোসেন বলেন, আমি নতুন এসেছি। এখনো কোনো কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। তবে এ ধরনের কোনো ঘটনা হওয়ার কথা না। আমি খোঁজ-খবর নিচ্ছি যদি এ ধরনের ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায় তবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মেডিসিন ৬০২ (পুরুষ) ওয়ার্ডের একই অবস্থা। ৪ঠা এপ্রিল ওই ওয়ার্ডে আসেন মুন্সিগঞ্জের গাড়িচালক মুক্তার হোসেন। শ্বাসকষ্ট ও কফের সঙ্গে রক্তের কারণে তাকে বেশ কয়েকদিন চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। তাই তার জন্য প্রয়োজন একটি বেডের। ওয়ার্ডে বেড ফাঁকা থাকলেও সেদিন মুক্তার হোসেনকে কোনো বেড দেয়া হচ্ছিল না। নানা অজুহাতে বেড ফাঁকা নেই বলে মুক্তার হোসেনের ছেলে ও তার স্ত্রীকে জানানো হয়। পরে ওই ওয়ার্ডের এক নারীকে ৩০০ টাকা দিয়ে একটি সিট পাওয়া যায়।

একই চিত্র অর্থপেডিকস ১০২ নম্বর ওয়ার্ডে। গত মাসে ট্রাকের ধাক্কায় আহত হন কিশোরগঞ্জের সাগর হোসেন। ডান হাত ভেঙে যাওয়ায় ভালো চিকিৎসার জন্য তার স্বজনরা নিয়ে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অর্থপেডিকস ১০২ নম্বর ওয়ার্ডের ১৬ নম্বর বেডে তিনি বেশ কিছুদিন ভর্তি ছিলেন। যদিও ভর্তির হওয়ার পর পর তাকে ওই ওয়ার্ডের মেঝেতে জায়গা করে নিতে হয়। ৮ই এপ্রিল সাগর হোসেনকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ছাড়পত্র দেয়।

যাওয়ার সময় সাগর ও তার মা মীনা বেগম বলেন, প্রথমে বেডের কোনো ব্যবস্থা করতে পারিনি। কোনো বেড ফাঁকা হলে সেখানে ওই ওয়ার্ডের সংঘবদ্ধ কয়েকজন টাকার বিনিময়ে অন্য লোক উঠিয়ে দেয়। অনেক বলার পরও আমরা কোনো সিটের ব্যবস্থা করতে পারিনি। অথচ এ ধরনের রোগীকে বেডে রাখা খুবই জরুরি। পরে ওই সংঘবদ্ধ চক্রকে ৪৫০ টাকা দেয়ার পর বেডের ব্যবস্থা হয়।

মীনা বেগম বলেন, আমার ছেলের হাত এখনো ভালো হয়নি। কিন্তু তাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থপেডিকস ১০২ নম্বর ওয়ার্ডের মাস্টার মো. জিল্লুর রহমান বলেন, আগে যারা দায়িত্বে ছিল তারা কীভাবে পরিচালনা করতো জানি না। আমাকে কিছুদিন ধরে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাই কারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত। তাদেরকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

৬ই মার্চ রাতের ঘটনা । খেলতে গিয়ে মাথায় আঘাত পায় ৫ বছর বয়সী সূর্য। প্রচণ্ড বমি শুরু হলে স্বজনরা তাকে নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসকরা অবজারভেশনের জন্য তাকে হাসপাতালের ২০৪ নম্বর মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করেন। রাত ২টায় সূর্যের স্বজনরা ওই ওয়ার্ডে গিয়ে দেখেন সেখানকার সেবিকারা তাদের বিশ্রাম কক্ষের দরজা বন্ধ করে গভীর ঘুমে। আয়াদের অনেক ডাকাডাকির পর সেই সেবিকা স্যালাইন ও একটি ইনজেকশন দেন। কিন্তু ওই ওয়ার্ডে সূর্যের জন্য নির্ধারিত ইউনিটে কোনো সিট পাওয়া যাচ্ছিল না। কারণ ওই ইউনিটের কিছু সিটে রোগী আর বাকি সব সিটে রোগীর আত্মীয়স্বজন ঘুমিয়ে আছেন। আবার এসব সিটের নিচে মেঝেতে আরো কিছু রোগী ঘুমিয়ে আছেন। ওয়ার্ডের সেবিকা, ওয়ার্ড বয়, আনসার সদস্য ও আয়াদের কাছে অনুরোধ করে কোনো সিটের ব্যবস্থা করা যায়নি। পরে কর্মরত এক সেবিকার পরামর্শে আয়াকে খুশি করার শর্তে একটি সিট পাওয়া যায়। বিনামূল্যের একটি সিটের জন্য সেদিন সূর্যের পরিবারকে গুনতে হয়েছিল ৫০০ টাকা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একে এম নাসির উদ্দিন এ বিষয়ে কথা বলতে চাননি।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২ হাজার ৬০০ বেডের মধ্যে ৭০ শতাংশ বেডই বিনামূল্যের আর ৩০ শতাংশ বেডে টাকা দিতে হয়। বিনামূল্যের বেডে আর্থিক লেনদেন শুধু অনিয়ম না এটা অপরাধ। বিনামূল্যের বেডে যদি কেউ টাকা নেয় আর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায় তবে অবশ্যই তাকে শাস্তি পেতে হবে।

কাজী জাহাঙ্গীর আরো বলেন, হাসপাতালের ডাক্তার সেবিকাদের যেকোনো সময় বদলি করা যায়। তবে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের মধ্যে যারা চাকরি করে তাদের যেকোনো সময় বদলি করা যায় না। তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হলেই তবে করা যায়। এজন্য এসব স্থানে একটা বড় সিন্ডিকেট তৈরি হয়। সূত্র: মানবজমিন