Wednesday , December 19 2018
Breaking News

খাল কেটে কুমির আনতে গিয়ে তীরে এসে তরী ডুবল তার!

স্বঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা আরিফুজ্জামান আরিফ। পুকুর চুরির গল্পের মতো শুধু অর্থ হাতিয়ে নেয়ার জন্য গ্রামের মধ্যে খাল খননের উদ্যোগ নেন। ঘটনাটি ঘটেছে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার গহেপুর গ্রামের কামরিয়া খাল খননকে কেন্দ্র করে। আর এই অপ্রয়োজনীয় খাল খননের জন্য নিজেই তৈরি করেছেন পকেট কমিটি। তদবির করে ৬৫ লাখ টাকাও বরাদ্দ পেয়েছেন।

সেই অনুযায়ী এক কিলোমিটার খাল খননের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে গ্রামবাসী। কারণ খালটি খনন করলে তাদের কোনো লাভ হবে না, বরং ক্ষতি হবে। কাটা পড়বে কৃষিজমি, বর্ষায় বন্যা হয়ে ফসল নষ্ট হবে। বিষয়টা যেন খাল কেটে কুমির আনার মতো।

এমন আশংকায় গ্রামবাসীর অভিযোগ পেয়ে সদর উপজেলার ইউএনও মো. ওয়াশীমুল বারী সরেজমিনে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পান। তাত্ক্ষণিক তিনি বন্ধ করে দেন খননকাজ। এর পর থেকে নানা মহলে ছুটে বেড়াচ্ছেন আরিফ। তীরে এসে তরী ডোবার মতো ব্যাপার। আরেকটু এগোলেই টাকা তাঁর পকেটে চলে আসত। কিন্তু সব ভেস্তে দিলেন ইউএনও।
জানা গেছে, সরকারি টাকা নিজের পকেটে নেওয়ার উদ্দেশ্যে আরিফ গঠন করেন কামরিয়া-পাকশিয়া পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি। তিনি নিজেই সমিতির সভাপতি আর স্ত্রী হাওয়া খাতুন কমিটির সাধারণ সম্পাদক। কমিটির অন্য সদস্যরা তাঁর আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠজন। কবে, কখন এ সমিতি গঠন হয়েছে গ্রামের কেউ তা জানে না। পকেট কমিটি করে ওই সমিতির মাধ্যমে খাল খননের উদ্যোগ নেন তিনি।

খাল খননের কোনো প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও আরিফ তদবির করে দুই কিলোমিটার খননের জন্য ৬৫ লাখ ৭৬ হাজার ২১১ টাকা বরাদ্দ আনেন। টেকসই পানিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প থেকে এ বরাদ্দ নেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এ কাজের দেখভাল করছে। দুই বছর আগেও একই প্রকল্প থেকে আরিফ টাকা বরাদ্দ এনে কামরিয়া খালের কিছু অংশ খনন করেন। এ বছর আরো দুই কিলোমিটার খননের জন্য পকেট কমিটির মাধ্যমে আবেদন করেন তিনি।

নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদন আসার আগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্মকর্তারা সরেজমিনে খননের জন্য প্রস্তাবিত এলাকা পরিদর্শন করেন। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর খনন করার পক্ষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে মতামত দেন।

তবে তার কোনটাই না করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বাস্তব অবস্থা তুলে না ধরে আরিফের পক্ষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নিজেদের মতামত পাঠান।

আর সেই মতামতের ভিত্তিতে খননকাজের অনুমোদন মেলে। বরাদ্দও আসে। এরই ধারাবাহিকতায় আরিফ নিজেই ড্রেজার মেশিন এনে গত ২৯ মার্চ কামরিয়া খালে খননকাজ শুরু করেন। খননকাজ শুরু হলে বিস্মিত হয় গ্রামবাসী।
তারা প্রশ্ন তোলে, এখন কেন খনন? খননের পর কী লাভ হবে গ্রামবাসীর? অতি বর্ষণে এলাকার জমি তলিয়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য যদি কামরিয়া খাল খনন করা হয় তাহলে আগে চিত্রা নদী খনন করতে হবে। কিন্তু চিত্রা এখন মৃতপ্রায়। ভরাট হয়ে বেদখল হয়ে গেছে। তাই খাল খনন করলেও পানি চিত্রায় যাবে না। তা ছাড়া বর্ষায় খাল দিয়ে বাইরের থেকে পানি এসে এলাকা তলিয়ে গিয়ে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আগে চিত্রা খনন না করে কামরিয়া খনন করা মানে টাকা পানিতে ফেলা দেওয়া, খাল কেটে কুমির আনা।

এতে উপকার না হয়ে ক্ষতি হবে গ্রামবাসীর। তা ছাড়া কামরিয়া খালের ওপর ছয়টি সেতু আছে। এসব সেতুর নিচে খনন করা সম্ভব নয়। খনন করলে সেতু ভেঙে পড়বে। সেতু ভেঙে পড়লে দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাবে। খনন করতে হলে আগে সেতু বড় করতে হবে। তা না হলে খনন করে কোনো লাভ হবে না। পানি এদিক-ওদিক কোনো দিকেই যেতে পারবে না। আটকে থাকবে বৃষ্টির পানি। তা ছাড়া খাল খনন করলে অনেকের ফসলি জমিও কাটতে হবে। তা না হলে খাল সমানুপাতিক হারে চওড়া হবে না।
এ বিষয়ে কামরিয়া-পাকশিয়া পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সভাপতি আরিফুজ্জামান আরিফ বলেন, ‘কামরিয়া ও পাকশিয়া বিল আর খালের জন্য বর্ষা মৌসুমে এলাকার শত শত বিঘা জমিতে জলাবদ্ধতা থাকে। চাষাবাদ হয় না। আমি নিজেই ৩০-৪০ বিঘা জমি চাষাবাদ করি। খনন হলে জলাবদ্ধতা দূর হবে। চাষাবাদ করতে সমস্যা হবে না। কিন্তু এলাকার কিছু ভূমিদস্যু খালের জমি বেদখল করে রেখেছে। খালের পাড় কেটে দখল করে নিয়েছে। খনন হলে তাদের দখলে থাকা জমি হারাতে হবে। এ জন্য তারা মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছে।’

পকেট কমিটির ব্যাপারে তিনি বলেন, পরিবারের সংজ্ঞা অনুযায়ী কমিটি পারিবারিক নয়।’ কমিটির সাধারণ সম্পাদক কে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী হাওয়া খাতুন এ কমিটির সাধারণ সম্পাদক।’ এ সময় স্বীকার করে বলেন, তিনি আওয়ামী লীগের কোনো কমিটিতে নেই। তবে গহেপুর গ্রামে আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচন পরিচালনার জন্য যে কমিটি গঠন হয় সেখানে যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ওয়াশীমুল বারী বলেন, এলাকাবাসীর অভিযোগ পেয়ে সরেজমিনে খাল এলাকা দেখে নানা অনিয়ম পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেছে খননকাজে কোনো উপকার হবে না। এ জন্য কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নিজের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, বরাদ্দের টাকা সমিতিকে দেওয়া হয়নি। কাজ না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সে ক্ষেত্রে বরাদ্দ টাকা ফেরত যাবে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা প্রকৌশলী ফজলুল হক বলেন, আবেদন পাওয়ার পর গত বছরের বর্ষা মৌসুমে সরেজমিনে তদন্ত করা হয়। এ সময় এ ব্যাপারে এলাকার কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। গত ২৯ মার্চ খননকাজ শুরু হলে এলাকাবাসীর কাছ থেকে অভিযোগ আসে। সরেজমিনে দেখে কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।