Wednesday , August 22 2018
Breaking News

যেভাবে গড়ে উঠে শ্রমিক আন্দোলন ও মে দিবসের ডাক

১লা মে। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষদের নিপীড়ন মুক্তির মহান দিবস। দিনটি মে দিবস নামে পরিচিত।মে দিবসের দুই রূপ, বিশেষ করে পাশ্চাত্যে। একটা হলো হাসি-খুশির, অন্যটা বেদনা ভারাক্রান্ত।। দিবসটির সূচনা হয় বিভিন্ন সময়ের শ্রমিক আন্দোলনের ধারাগুলোর মহামিলনের মাধ্যমে। ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হাজার হাজার শ্রমিক আট ঘণ্টা দৈনিক শ্রমের দাবিতে মিলিত হয়েছিলেন। এই আন্দোলনটি আমেরিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৮৮৬ সালের ১ মের পরদিন ছিল রবিবার, তাই শ্রমিক বিদ্রোহের দ্রোহটি বিস্ফোরিত হতে পারেনি। ৩ মে সারা আমেরিকায় যখন শ্রমিকরা আন্দোলনে উত্তাল হয়, সেদিন ম্যাকমিক রিপার কারখানায় আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে ছয় শ্রমিক নিহত হন। ৪ মে পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারে এক বিরাট শ্রমিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেদিনের সমাবেশটি প্রতিবাদী হলেও ছিল শান্তিপূর্ণ। সমাবেশের শেষ বক্তা ফিলডেলের বক্তৃতার শেষের দিকে দূর থেকে একটি বোমা এসে পড়ে সমাবেশস্থলে। সেই সময় একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। পুলিশ সমাবেশের শ্রমিকদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। শ্রমিকরাও রুখে দাঁড়ায়। পুলিশ শ্রমিক সংঘর্ষে চারজন শ্রমিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, নিহত হয় সাত পুলিশ। সভাস্থলে নিহত একজন কিশোর রক্তে ভেজা জামা খুলে বিজয়ের পতাকা উড়িয়ে দেয়, যা পরবর্তীকালে লাল ঝা-া বা লাল পতাকার মর্যাদা পায়।

মহান মে দিবস একদিনে সূচিত হয়নি। এটা ছিল দীর্ঘদিনের আন্দোলন সংগ্রামের ফসল। শ্রমজীবী মানুষের প্রথম সংগঠন গড়ে ওঠে ১৬৮৪ সালে। তখনও আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষিত হয়নি। ঠেলাগাড়ির চালকরা প্রথম ঠেলা শ্রমিক ইউনিয়ন গড়ে তোলেন। ১৭৮৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। আর ১৮৪২ সালে আমেরিকায় শ্রমিক শ্রেণী ট্রেড ইউনিয়ন এবং ধর্মঘট করার অধিকার পায়। ১৮২০ থেকে ১৮৪০ সাল পর্যন্ত শ্রমিক শ্রেণী দৈনিক কর্মঘণ্টা কমানোর দাবিতে অনেকবার ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে। বিশ্বের প্রথম নারী শ্রমিকদের ধর্মঘট পালিত হয় আমেরিকায় ১৮২৩ সালে। বিশ্বের শিল্প-কারখানাগুলোয় শ্রমিক আন্দোলন শুরু হয় ১৮২৮ সালে। তার আগে ১৮২৭ সালে ফিলাডেলফিয়াতে ১৫টি শ্রমিক সংগঠন একত্রিত হয়ে একটি ফেডারেশন গড়ে তুলে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশ দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমিক শ্রেণী নিজ নিজ দেশে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলে । ১৮৬৪ সালে মার্কস এঙ্গেলসের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সমিতি। ইতিহাসে এটাই প্রথম আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী সংগঠন নামে খ্যাত। ১৮৬৬ সালের আগস্ট মাসে ৬০টি ট্রেড ইউনিয়নের নেতারা আমেরিকার বালটিমোরে মিলিত হয়ে গঠন করে, ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন। সংগঠনটির সভাপতি নির্বাচিত হন মার্কিন শ্রম আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব উইলিয়ম এইচ সিলভিস। ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন ৮ ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেয়। এ ধরনের শ্রমিক আন্দোলনের ফসল এক সময় শ্রমিকরা পেয়েছিল। তা ঘটেছিল ১৮৭০ সালে। ১৮৭০ সালের ১৮ মার্চ প্যারিসের শ্রমিকরা শহর থেকে বুর্জুয়া শাসকদের হটিয়ে নিজেদের হাতে ক্ষমতা নিয়ে নেয়। এ সম্পর্কে মার্কস এঙ্গেলস লিখেছেন, এ এক অবিস্মরণীয় কীর্তি। দশ দিন পরে ২৮ মার্চ তারিখে শ্রমিকরা গঠন করেছিল পৃথিবীর প্রথম প্রলেতারিয়েত রাষ্ট্র প্যারিস কমিউন।

ভারত বর্ষে ১৯২৩ সালে মাদ্রাজে সর্বপ্রথম মে দিবস পালিত হয়। কমিউনিস্ট নেতা সিঙ্গাভের্ল্য চেটিয়া মেয়ের লাল শাড়ির অংশ কেটে মে দিবসের লাল পতাকা উত্তোলন করেন। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার প্রাণকেন্দ্র কলকাতায় ১৯২৭ সালে প্রথম মে দিবস পালন করা হয়। দেশ বিভাগের পূর্বে নারায়ণগঞ্জে মে দিবস পালিত হয় ১৯৩৮ সালে। ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৫২ সালের মে মাস পর্যন্ত মে দিবস সীমিত পরিসরে পালিত হয়। ১৯৫৩ সালে পল্টনে মে দিবসের জমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। তবে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণী প্রথমবারের মতো বিপুল উৎসাহ নিয়ে মে দিবস পালন করে। আদমজীতে ৩০,০০০ শ্রমিক লাল পতাকা নিয়ে সভা সমাবেশ মিছিলে অংশ নেয়। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারির পূর্ব পর্যন্ত মে দিবস বেশ বড় আকারে সমাবেশের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হতে থাকে। এই সময় ১ মে দিনটিকে সরকারী ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণার দাবি ওঠে। ১৯৭০ সালে মে দিবস পালনে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা যায়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা সংযোজিত হয়। ’৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর শ্রমিকদের বিরাট অংশ বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন করে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে মে দিবস পালিত হয়। স্বাধীনতার পর মে দিবসটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়। বঙ্গবন্ধু ১ মে’কে মহান মে দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সরকারী ছুটির দিন ঘোষণা করেন। ১৯৭২ সালের মহান মে দিবস উপলক্ষে তৎকালীন সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধু জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। বঙ্গবন্ধু মহান মে দিবসকে জাতীয় দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

স্বাধীনতার পর দেশের শ্রম আন্দোলনে তৈরি হয় নানা বিভাজন। ১৯৭২ সালটি ছিল শ্রমিক সংগঠনের মধ্যকার দ্বন্দ্বে ভরপুর। যদিও এই সময়টা ছিল ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুকূল পরিবেশ। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর শ্রমিক শ্রেণীর সংগঠনগুলোতে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আদর্শিক চর্চার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় দলীয় রাজনৈতিক আদর্শিক ধারার চর্চা। ১৯৭৯ সালে দেশের প্রথম সেনাশাসিত সরকার মে. জে. জিয়া তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে মৌলবাদী স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করতে শুরু করলে শ্রমিক সংগঠনগুলোয় তার প্রতিফলন ঘটে, জামায়াতের মতাদর্শের শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন নামে শ্রমিক সংগঠন গঠিত হয়। এভাবেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তিতে শ্রমিক সংগঠনগুলো জড়িয়ে পড়ে। ফলে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে শ্রমিক সংগঠনগুলো রাজনৈতিক নেতাদের গদি রক্ষা এবং গদিতে নেয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত থাকে। এর ফলে দেখা যায় শ্রমিক রাজনীতির নেতৃত্ব আর শ্রমিক শ্রেণীর হাতে থাকে না। বাংলাদেশে এভাবেই শ্রমজীবী মানুষের রাজনীতি বুর্জোয়া শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এই ধরনের বুর্জোয়া রাজনীতি ১৯৭৫-এর পরবর্তী সময়ে জেঁকে বসে রাজনৈতিক অঙ্গনে। পুঁজিপতি বুর্জোয়ারা রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করার ফলে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থের স্পষ্ট রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারিত হয় না।

অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন শ্রম সেক্টরে শ্রমিক সংগঠনের নামে এক ধরনের চাঁদাবাজি চলছে, আর এই চাঁদাবাজির কবলে পতিত হচ্ছে মূল শ্রমজীবী মানুষ। ডান বাম উত্তর বা দক্ষিণ যে কোন পন্থী শ্রমিক সংগঠন হোক না কেন, আদর্শিক সাইন বোর্ড টাঙ্গিয়ে এরাও শ্রমজীবীদের কাছ থেকে চাঁদা নিচ্ছে। শ্রমিক শ্রেণীর এই বিভাজনের মাধ্যমে মূল স্বার্থটা হাতিয়ে নিচ্ছে পুঁজিপতিরা, আর রাজনৈতিক ব্যানারে তাদের সহযোগিতা করছে এক শ্রেণীর নামসর্বস্ব শ্রমিক। ট্রেড ইউনিয়ন করা কথিত নেতাদেরকেও দেখা যায় ট্রেড ইউনিয়ন করার বদৌলতে কোন বাম সংগঠনের মূল নেতৃত্বে চলে আসে, আর মূল নেতৃত্বে আসার পর তিনিও মধ্যবিত্তের কাতারে চলে যান। শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থে বা আন্দোলনে তার কোন সংশ্রব থাকে না। প্রকৃত শ্রমজীবী মানুষের সংগঠন, শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থে ও নেতৃত্বে যতদিন পর্যন্ত শ্রমিক সংগঠন গড়ে না তুলতে পারবে, ততদিন শ্রমিক শ্রেণী আদর্শের রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে উঠবে না।