Monday , May 21 2018
Breaking News

চলতি বছরে বারছে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন, কত হবে নতুন বেতন কাঠামো?

দেশে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আবারও ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। এই মজুরি বোর্ড ছয় মাসের মধ্যে শ্রমিকদের জন্য একটি নতুন বেতন কাঠামো পুনঃনির্ধারণ করে তা বাস্তবায়নের সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন জমা দেবে। তবে, এই বেতন কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শ্রমিক নেতারা। তারা বলছেন, শ্রমিকদের বেতন বাড়লে কত বাড়বে?

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) হিসেবে, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য মূলত তিনটি মডেলকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর প্রথম মডেলটি হচ্ছে, দারিদ্র্যসীমার ওপরে অবস্থানকারী একজন শ্রমিকের মাসিক খরচের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি ঠিক করা। দ্বিতীয় মডেলটি হলো, কাঙ্ক্ষিত পুষ্টি অর্জনের জন্য একজন মানুষের যে সুষম খাবার, তা বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি ঠিক করা। তৃতীয় মডেলটি হলো, শ্রমিকদের বর্তমান জীবনধারণের খরচের হিসাব বিবেচনা করে তার ওপর ভিত্তি করে ন্যূনতম মজুরি ঠিক করা।

সিপিডি বলেছে, দারিদ্র্যসীমার ওপরের স্তরে অবস্থানকারী প্রায় পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারে ‘জাতীয় খানা আয়-ব্যয় জরিপ’ অনুযায়ী খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবা কেনার ব্যয় মাসে ৯ হাজার ২৮০ টাকা। পরিবারের প্রধান উপার্জনকারীকে এক্ষেত্রে আয় করতে হবে ৬ হাজার ৪৪৫ টাকা। সিপিডির হিসেবে পরবর্তী দু’টি মডেলে এই পরিমাণ আরও বাড়ে। কাঙ্ক্ষিত পুষ্টিহার অনুযায়ী খাবার গ্রহণ ও জীবনধারণের জন্য একজন শ্রমিকের প্রতিমাসে ন্যূনতম মজুরি প্রয়োজন ১৭ হাজার ৮৩৭ টাকা। প্রকৃত খরচ অনুযায়ী বিবাহিত একজন শ্রমিকের মাসে আয় করতে হবে ১০ হাজার ৩৫২ টাকা।

উল্লেখ্য, পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য সর্বশেষ গত ২০১৩ সালের নভেম্বরে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করে সরকার। ঘোষণার এক মাস পর ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়। সে অনুযায়ী এন্ট্রি লেভেলে বর্তমানে একজন শ্রমিক ন্যূনতম পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন। এ ছাড়া বছরে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া বাধ্যতামূলক করা আছে। দেশে বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ী, পাঁচ বছর পর পর ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনা করা যায়। এ ছাড়া বিশেষ পারিপার্শ্বিক অবস্থায় যেকোনও পর্যায়ে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার নিয়ম আছে। তবে এ ক্ষেত্রে সরকার ৫ বছরের আগেই সরকার স্বেচ্ছায় মজুরি বোর্ড গঠন করলো সরকার।

সরকারের একটি স্থায়ী ন্যূনতম মজুরি বোর্ড রয়েছে। চার সদস্যের সেই বোর্ডের চেয়ারম্যান হলেন সিনিয়র জেলা জজ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম। এই বোর্ডের অন্য তিন সদস্য হলেন মালিকপক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশ এমপ্লায়ার্স ফেডারেশনের শ্রম উপদেষ্টা কাজী সাইফুদ্দীন আহমদ, শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশ শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি ফজলুল হক মন্টু, নিরপেক্ষ প্রতিনিধি হিসেবে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন। রবিবার পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে গঠিত স্থায়ী মজুরি বোর্ডের সদস্যদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান এবং জাতীয় শ্রমিক লীগের মহিলা-বিষয়ক সম্পাদক শামসুন্নাহার বেগম।

নতুন মজুরি বোর্ড প্রসঙ্গে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগামী ছয় মাসের মধ্যে এই কমিটি পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন কাঠামো যাচাই-বাছাই করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দেবে। এরপর সরকার পোশাক শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করবে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি ও মজুরি বোর্ডের সদস্য সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বোর্ড বসেই ঠিক করবে। শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর জন্য আমরাই সরকারকে বোর্ড গঠনে চিঠি দিয়েছি। তাই শ্রমিকদের বেতন বাড়ছে এ নিয়ে তো কোনও দ্বিধা নেই। সব কিছু বিবেচনায় নিয়েই নতুন বেতন কাঠামো সুপারিশ করা হবে। এ মুহূর্তে এর বেশি কিছু বলা যাবে না।’

শ্রম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে গত ৮ নভেম্বর তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ পোশাক খাতের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করতে শ্রম মন্ত্রণালয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেয়। বিজিএমইএ-এর এই উদ্যোগকে সরকার ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বলে মন্তব্য করেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাভারের এ আর গার্মেন্টস-এর শ্রমিক শাহানাজ খানম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যে বেতন পাই, তা দিয়ে সংসার চলে না। পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা বেতনে কি আর সংসার চলে? বর্তমান বাজারে ঘরভাড়া পরিশোধে চলে যায় বেতনের অর্ধেক। বাকি টাকা দিয়ে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরের চাল কিনে সংসার চালানো যে কত কঠিন, তা বলে বোঝানো যাবে না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মালিকরা সব সময় বেতনের সঙ্গে ওভার টাইম ধরে বেতন বোঝান। ওভার টাইম তো বেতন নয়। এছাড়া ওভার টাইম তো সবার পক্ষে করাও সম্ভব নয়। ওভার টাইম কেউ কেউ করেন, সবাই করেন না। যদি একজন শ্রমিক ওভার টাইম না করেন, তাহলে তো তিনি ওভার টাইমের বিল পাবেন না। তাহলে তার সংসার চলবে কিভাবে?’ বর্তমান বাজারে ন্যূনতম বেতন হওয়া প্রয়োজন কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা বলেও তিনি মনে করেন।