Saturday , July 21 2018
Breaking News

মা-হারা সন্তানদের যেভাবে গড়ে তুলছেন বাবুল আকতার

মা-হারা দুই সন্তানকে নিয়ে একের পর এক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন আলোচিত সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আকতার। দুর্বৃত্তদের হাতে প্রিয়তমা স্ত্রী মিতু নিহত হওয়ার পর একসময় শ্বশুরবাড়িও যখন ছাড়তে হলো, বৃদ্ধা মা-ই ছিলেন তার ছোট্ট দুটি সন্তানের জন্য পরম নির্ভরতার আশ্রয় হয়ে। কিন্তু গত বছরের নভেম্বরে মায়ের মৃত্যুর পর যেন আরেক দফা হোঁচট খেলেন সাহসী এই পুলিশ অফিসার। সে আঘাত সামলে নিয়ে নতুন রণনীতিতে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। অভিনব কায়দায় তিনি মানুষ করছেন দুই সন্তান মাহমুদ মাহির ও তাবাচ্ছুম তানজিলাকে।

দেড় বছর আগেও তার সকাল হতো ৮টায়। প্রিয়তমা স্ত্রী নিহত হওয়ার পর সে রুটিন বদলে গেছে সময়ের তাড়নায়। মেয়ে এখন কেজিতে পড়ে, আর ছেলে তৃতীয় শ্রেণিতে। মেয়ের স্কুল সকালে বলে রোজ ভোর ৬টায় উঠতে হয় বাবুল আকতারকে। আগে নিজে ফ্রেশ হন, তারপর মেয়েকে ওঠান। প্রথম প্রথম এত ভোরে উঠতে চাইতো না আদরের মেয়েটি। রাতে ঘুমানোর আগে বলে রাখতো, “বাবা, আমি যদি সকালে না উঠি, তাহলে আমার চোখে পানি দিয়ে দিও, ঠিক আছে?” আদরে আদরে মেয়েকে ঘুম থেকে উঠিয়ে রেডি করে নাশতা খাইয়ে স্কুলে নিয়ে যান বাবুল আকতার। ক্লাসে বসিয়ে আসার সময় বাবাকে কাছে টেনে বাবাভক্ত মেয়ে কানে কানে বলে, “বাবা, আমাকে কিন্তু নিতে আসবা।” এরপর বাসায় ফিরে ছেলেকে ঘুম থেকে উঠিয়ে নাশতা করিয়ে তারপর যান অফিসে। এরপর শত ঝামেলার মাঝেও তাদেরকে স্কুল থেকে নিয়ে আসেন তিনি। সারাদিন ফোনে তদারকি করেন। মেয়ে দুপুরের ভাতটুকু বাবার হাতে ছাড়া খায় না। মেয়েকে ঘুম পাড়ানোর পর আবার ছেলেকে আনতে যাওয়া, এসবের মাঝে অফিস করা এখন বাবুল আকতারের নিত্যদিনের রুটিন। এতকিছুর পরেও সন্তানদের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ছাড় দিচ্ছেন না বাবুল। শিশুদের দৈহিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে নিচ্ছেন বিশেষ যত্ন।

মাঝে নানাবাড়ি থাকার সময় বাচ্চারা খুব ডিভাইস নির্ভর হয়ে উঠেছিল। ডিভাইসের অত্যধিক ব্যবহার মানে যে শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ক্ষতি -সে কথা তাদের বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন বাবুল আকতার। অত্যধিক ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক নিয়ে নানা গল্প আর ভিডিও দেখিয়েছেন তাদের। বাবুল আকতারের ভাষায়, “আমার ছেলেমেয়ে আমার দেখা সবচেয়ে যৌক্তিক শিশু। যেকোনও বিষয় তাদের সঠিক যুক্তিতে বুঝালে তারা বুঝে। আমি নিজে বাচ্চাদের সামনে পারতপক্ষে ডিভাইস ব্যবহারই করি না। প্রতিদিন আমরা তিনজন একসাথে গল্পের বই পড়ি আর ড্রইং করি। প্রথমদিকে বই পড়তে তারা পছন্দ করত না। আর এখন গল্প না পড়ে রাতে ঘুমাতেই পারে না।”

বিগত ২০১৬ সালের ৫ জুন পুলিশ হেডকোয়ার্টারের তদানীন্তন পুলিশ সুপার ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে নির্মমভাবে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। মায়ের মৃত্যুর পর থেকে ছেলে মাহির মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কারও সাথে মিশতে বা খেলতে চাইত না। কিন্তু সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে হলে খেলাধুলা তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রথমদিকে ছেলেকে খেলা দেখাতে স্টেডিয়ামে নিয়ে যেতেন বাবা বাবুল আকতার। তারপর ছেলে নিজেই খেলাধুলায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। পাশাপাশি যেহেতু ভাই-বোন দুজনেই ছবি আঁকতে ভালোবাসে, তাই তাদের ছবি আঁকার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন তিনি। নানা এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিজে ছেলেটা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়। এতটা মানসিক চাপ আর প্রতিকূলতার মাঝেও আত্মবিশ্বাস নিয়ে পড়াশুনা করে নিয়মিত ভালো করছে সে। রোজই খাতায় ‘স্টার’ নিয়ে আসে। বাবুল আকতার মজা করে বলেন, “এত স্টার কোথায় রাখব?” ছেলে হাসে।

সন্তানদের শুধু আত্মবিশ্বাসী করেই শেষ নয়। ইদানিং নিজের বাচ্চাদের সামাজিকীকরণের দিকেও নজর দিচ্ছেন তিনি। যেন তাদের ভবিষ্যত কর্মজীবনে তা ইতিবাচক প্রভাব রাখে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আজ সকালে কিছু ছবি পোস্ট করেন বাবুল আকতার, যেখানে দেখা যায় সন্তানদের নিয়ে বিভিন্ন মানুষজনের সাথে সময় কাটাচ্ছেন তিনি। এ ব্যাপারে তিনি লেখেন, “শিশুর সামাজিকীকরণ আমরা অনেক বেশি উপেক্ষা করে থাকি। বাচ্চা কিছু বুঝবে না কিংবা বিরক্ত হয়ে যাবে অথবা বিরক্ত করবে ভেবে আমরা বাচ্চাদের অনেক ক্ষেত্রে অপরিচিত পরিবেশ থেকে দূরে দূরে রাখি। অথচ অপরিচিত পরিবেশে নিয়ে গেলে সহজেই বাচ্চা অন্যদের সাথে মেলামেশা, নিজের আবেগ প্রকাশ এবং অন্যের অনুভূতিকে সম্মান করা শিখতে পারে, যা তাদের ভবিষ্যত কর্মজীবনে রাখতে পারে ইতিবাচক প্রভাব। নানা জায়গায় আমার সঙ্গী হয় আমার সন্তানেরা এবং তখন আশেপাশের সবাই দারুণ স্নেহে তাদের আপনও করে নেন। ধন্যবাদ সবাইকে।”

বাবুল আকতারের এই পোস্টে লাইক পড়ে দু হাজারের কাছাকাছি। দুই সন্তান মাহির ও তানজিলাকে শুভ কামনা জানাতে থাকেন শত শত শুভানুধ্যায়ী। তার মধ্যে একটি কমেন্ট ছিল, “নীরবে আপনি যেভাবে গণশিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন তা অনুকরণীয় । দোয়া করি, আপনার সন্তানেরা যেন সুসন্তান হয়ে দেশ ও জাতির সেবায় এগিয়ে আসতে পারে।”

সত্যি তো! নানা অপরাধকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন ও অপরাধী পাকড়াওয়ে সাহসী ভূমিকা রাখা এসপি বাবুল তার বর্তমান ট্র্যাজেডি টাইপ জীবনযাপনের মাঝেও আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছেন মা-হারা সন্তানদের কীভাবে গড়ে তুলতে হয়।