Friday , October 19 2018
Breaking News

নায়করাজকে নিয়ে যা বললেন তার স্ত্রী

বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক। মৃত্যুর পর নায়করাজ রাজ্জাকের ৭৭তম জন্মদিন আজ মঙ্গলবার (২৩ জানুয়ারি)। দেশ সেরা এই নায়কের জন্মদিন উপলক্ষে পরিচালক সমিতি ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

নায়করাজ রাজ্জাকের স্ত্রী খায়রুন্নেসা লক্ষ্মী কিছু স্মৃতি কথা:- তিনি নাকি ছোট বেলা থেকেই খুব জেদি ছিলেন। যেটা ভালো মনে করতেন সেটিই করতেন। ১৯৬৪ সালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় ঢাকায় চলে আসেন তিনি। এতে পরিবারের কারো মত ছিল না।

ওই সময় ঢাকায় পরিচিত বলতে কেউ ছিল না। ঢাকা শহরে এসে ফুলবাড়িয়া ট্রেন স্টেশন থেকে নেমেছি বড় ছেলে বাপ্পারাজ (বাপ্পা) কে কোলে নিয়ে। সেখান থেকে সোজা চলে যাই মিরপুর। কিন্তু মিরপুরের পরিবেশ পছন্দ হলো না। এরপর চলে আসি কমলাপুর এলাকায়। সেখানেই তিনি ছোট্ট একটা বাসা ভাড়া নিলেন।

প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক আবদুল জব্বার বললেন, তুমি কামাল সাহেবের অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে কাজ করো। এরমধ্যে মজনু নামে একজন নাট্যকর্মীর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। তার সহায়তায় মঞ্চে নাটক এবং চলচ্চিত্রে অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জানালেন সে অভিনেতা হতে চান। ওই সময় কেউ তার কথায় আগ্রহ দেখালেন না। তখন প্রয়াত রহমান বেশ ব্যস্ত অভিনেতা। তিনি রাজ্জাকের ইচ্ছার কথা জানতেন। একদিন উনি রাজ্জাককে বললেন- এই, তুমি এভাবে ফিল্মের ‘ক্যান’ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন? ওটা ফেলে দাও। তা না হলে তুমি সারা জীবনেও অভিনেতা হতে পারবে না।

এ সময় রাজ্জাক নিরুপায় ভঙ্গিতে বললেন- আমি আসলে এই মূহুর্তে কি করব তা বুঝতে পারছি না। তখন রহমান সাহেব তার ঘাড়ে হাত দিয়ে বললেন, ফিল্মের অ্যাসিস্টেন্ট গিরি ছাড়ো। অভিনয়ের চেষ্টা করো।

রাজ্জাক বাসায় এসে আমাকে সব কিছু খুলে বললেন। তখন আমি বললাম, দেখো তোমার যা ভালো মনে হয় সেটাই করো। সৌভাগ্য ক্রমে ‘আখেরি স্টেশন’ নামে একটি সিনেমায় ছোট্ট একটা চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে গেলেন। ছোট্ট পার্ট, স্টেশনের কাউন্টারে টিকিট বিক্রি করা।

এরপর তিনি আর কোনো কাজ পাচ্ছেন না। এদিকে, কলকাতা থেকে আসার সময় যে টাকা নিয়ে এসেছেন সেটা শেষ হয়ে যায়। এমন সময় কিভাবে সংসার চলবে? এ পরিস্থিতিতে ঢাকায় থাকব? নাকি আবার কলকাতায় চলে যাব? প্রচণ্ড মানসিক সংকট শুরু হলো।

অবশ্য কলকাতায় চিঠি লিখলেই টাকা চলে আসবে। কিন্তু তিনি পরিবারের কাউকেই তার এই কষ্টের কথা জানাতে চাননি। কেননা, ওই যে আমি বললাম তার মধ্যে প্রচণ্ড জেদ ছিল। হাড়বেন না কখনো।

তিনি একদিন আমাকে বললেন, লক্ষ্মী কি করা যায় বলতো। সে সময় আমি বললাম, না। কলকাতায় আর ফিরে যাওয়া যাবে না। তুমি হারবে না। তুমি ভেঙে পড়ো না। আল্লাহ তায়ালা নিশ্চয়ই আমাদের দিকে মুখ তুলে চাইবেন। তুমি চেষ্টা করতে থাকো। আমি তোমার সঙ্গে আছি। তুমি কোনো চিন্তা করো না।

ইতিমধ্যে জহির রায়হানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে। তারপরের কথা তো সবার জানা, জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ ছবিটি রাজ্জাকের অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করে দেয়। তার পায়ের নিচে শক্ত মাটি এনে দেয়। চলচ্চিত্র আর সংসারকে ঘিরে ছিল তার সব সুখ। জীবনের শেষ ৫ বছর অসুখের সঙ্গে প্রচণ্ড লড়াই করেছেন। বারে বারে ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছেন। সত্যি বলতে অসুখ-বিসুখকেও হারিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। সুস্থ অবস্থায় পরিবারের সবার হাতে প্রশান্তির ঘুম ঘুমিয়ে পড়লেন। তার জন্য সবাই দোয়া করবেন।

উল্লেখযোগ্য রাজ্জাক অভিনীত ছবির মধ্যে রয়েছে- স্লোগান, আমার জন্মভূমি, অতিথি, কে তুমি, স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা, প্রিয়তমা, পলাতক, ঝড়ের পাখি, খেলাঘর, চোখের জলে, আলোর মিছিল, অবাক পৃথিবী, ভাইবোন, বাঁদী থেকে বেগম, সাধু শয়তান, অনেক প্রেম অনেক জ্বালা, মায়ার বাঁধন, গুণ্ডা, আগুন, মতিমহল, অমর প্রেম, যাদুর বাঁশী, অগ্নিশিখা, বন্ধু, কাপুরুষ, অশিক্ষিত, সখি তুমি কার, নাগিন, আনারকলি, লাইলী মজনু, লালু ভুলু, স্বাক্ষর, দেবর ভাবী, রাম রহিম জন, আদরের বোন, দরবার, সতীনের সংসার।

নায়করাজ রাজ্জাক ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। গত বছরের ২১ আগস্ট (২০১৭ সালে) ঢাকায় অসংখ্য ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান রাজ্জাক।