Wednesday , December 19 2018
Breaking News

বাসে হয়রানি থেকে বেঁচে যাওয়া ঢাবি শিক্ষার্থীর ‘লোমহর্ষক’ বর্ণনা

নগর জীবনে গণপরিবহনে নারী হয়রানি ঘটনা দিনদিন বাড়ছে। সকালে কর্মস্থল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া এবং বিকেলে ফেরার পথে শঙ্কা নিয়েই যাতায়াত করছেন নারীরা। পাশের পুরুষ যাত্রী থেকে শুরু করে বাসের হেলপার কিংবা কন্ডাক্টরের লোলুপ দৃষ্টি থেকে রেহাই পাচ্ছেন না নারীরা। রাজধানীসহ সারাদেশে চলন্ত বাসে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে বেশকিছু।

রোববার সকালে এমন বাজে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী তাসনিমা আনজুম তিথি। তবে নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কোনরকম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই নিজেকে রক্ষা করতে সমর্থ হন তিনি। এরপরই তিনি তার সেই অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যক্তিগত ওয়ালে তুলে ধরেন। যা ইতোমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বাস থেকে দ্রুত লাফিয়ে নামতে গিয়ে কাঁধে কিছুটা ব্যথা পেলেও সুস্থ আছেন তিথি।

টুয়েন্টিফোর লাইভ নিউজপেপারকে ঢাবি শিক্ষার্থী তিথি বলেন, ‘আজকে সকাল ১০টার দিকে নতুনবাজার যাওয়ার জন্য আজিমপুর থেকে দেওয়ান বাসে উঠেছিলাম। ড্রাইভারের পেছনের দিকে সামনে থেকে ৩ নাম্বার সিটে জানালার পাশে ফাঁকা পেয়ে বসেছিলাম। সকাল ১১.৪৫ এর দিকে বাস উত্তর বাড্ডায় আসতেই দেখছি সকলে নেমে যাচ্ছে। আর গেট আগলে দাঁড়িয়ে আছে হেলপার। বই পড়ায় মগ্ন থাকায় বিষয়টি খেয়াল করিনি। পরে সহযাত্রী একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, কোন সমস্যা কিনা। উনি বললেন, হেল্পার নেমে যেতে বলছে। আমি কিছু বোঝার আগেই উনি নেমে গেলেন।’

তাসনিমা আনজুম তিথি বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে দরজার কাছে যেতেই বাসটি স্টার্ট নিলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই গতিবাড়লো বাসের। ড্রাইভার অদ্ভুত গলায় আমাকে বাসে বসতে বললো। অথচ বাসে কেউ নাই। এরপর ১৩/১৪ বছরের একটি ছেলে আর ২৩/২৪ বয়সী একটি ছেলে লাফ দিয়ে বাসে উঠলো। বন্ধ করা হলো বাসের দরজা।’

এমন অবস্থায় তিথি ‘ঘাবড়ে’ গেলেও হিতাহিত জ্ঞান হারাননি। তিনি বলেন, ‘অবস্থা সুবিধার মনে না হওয়ায় বললাম, ‘আমি এম্বাসিতে যাবো, ওখানে ১ মিনিট দেরি হলেই পুলিশ আমার খোঁজ করবে। বাসে যেহেতু সমস্যা, আমাকে নামিয়ে দিন। কথা শেষ না হতেই ড্রাইভার হেল্পারকে গালি দিয়ে বললেন, ‘শালা গেট লাগা।’ এরপরই রিস্ক নিয়ে কোনরকমে বাস থেকে দিলাম এক লাফ। পড়লাম এক বাদামওয়ালার উপর।’

নিচে পড়ে গেলেও নাম্বার নিতে ভোলেননি ঢাবির এই শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, নিচে নেমে দেখি বাসে আরও দুইজন লাফিয়ে উঠলো। ড্রাইভার আমাকে বলছিলো ‘আপা আপনি বাসে ওঠেন, এক্ষুণি ওঠেন। বাসটির নাম্বার দিল ঢাকা মেট্রো ব ১১-৭৮৪০।’

কিছুটা হতাশা ব্যক্ত করে ফেসবুক পোস্টে তিখি লেখেন, ‘এসব নাম্বার দেখে কোনো লাভ নাই। কিছু করতেও পারবো না। এদেশে ধর্ষণ করে নারীকে মেরে ফেললেও মেয়ের দোষ হয়। হয় পোশাকের দোষ।’

সকলকে পরামর্শ দিয়ে তিথি বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে কেউ পড়লে যেভাবেই হোক বাস থেকে নেমে যাবেন। প্রয়োজনে একটা লাফ দিয়েন। হাত পা ভাঙ্গলে ভাঙ্গলো, বড়জোর মরেই গেলেন আরেকটা বাসের নিচে পড়ে। স্টিল সেটা ভালোমতো মরা হবে বলে আমি মনে করি। সবাই ভালো থাকবেন। আজকাল আর অন্ধকারের অপেক্ষা করবেন না, দিনেদুপুরেও চলাফেরায় যথেষ্ট সতর্ক হোন।’

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পথেঘাটে এমন হয়রানির ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে। তবে নারীরা লজ্জা, ভয়, নিরাপত্তা বা আতঙ্কের কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো প্রতিবাদ করেন না। অনেক ক্ষেত্রে আবার প্রতিবাদ করলে বিব্রতকর ঘটনার সম্মুখীন হতে হয় নারীদের। অনেক সময় নিপীড়নকারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর পরিবর্তে অভিযোগকারীকে নিয়ে হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আইনি প্রক্রিয়াও জটিল বলে অনেকে আইনের আশ্রয় নিতে চান না। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিথিও থানায় কোন অভিযোগ করেননি।

এদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট’ তাদের এক গবেষণায় দেখেছে, দেশে পাবলিক বাসের চলাচলকারী ৪১ শতাংশ নারীই যৌন হয়রানির শিকার হন। দুর্ভোগ, যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের আশঙ্কায় পাবলিক বাসে যাতায়াতে অনীহা রয়েছে ১৩ শতাংশ নারীর। আর মোট নারীর মাত্র ২০ দশমিক ৭ শতাংশ নারী পাবলিক বাসে যাতায়াত করেন।

হয়রানির শিকার হলে কী করবেন?: নারীদের সবরকমের নিরাপত্তা আইনি সহয়তার জন্য কাজ করছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন। বিভাগটির এসি আসমা আরা জাহান বলেন, ‘যে কোনো ধরনের সহিংসতার ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত বা ভিকটিম নারীরা সহায়তা চেয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। ভিকটিম, তার পরিবারের সদস্য এবং সাক্ষীর কথা শুনে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। ভিকটিমের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে আইনি সহায়তা ছাড়াও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়। নারী ও শিশু ভিকটিমের বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে দেখা হয় এবং নারী পুলিশ সদস্য বিষয়টি তদারক করেন।’

সহায়তার জন্য যোগাযোগ: উইমেন সাপোর্ট এন্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ; তেজগাঁও থানা কমপ্লেক্স, তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫। ডিউটি

অফিসার : ০১৭৪৫৭৭৪৪৮৭, ০২-৯১১০৮৮৫। হেল্পলাইন : ০১৭৫৫৫৫৬৬৪৪, ০১৭৫৫৫৫৬৬৪৫, ০১৭৩৩২১৯০০৫, ০১৭৩৩২১৯০৩০।

ইমেইল : vsc.dmp@dmp.gov.bd