Monday , July 23 2018
Breaking News

বাংলাদেশের জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের বেতন ও বোনাসের তালিকা আপনাকেও অবাক করবে

সিরিজের মাঝপথে বোনাস ঘোষণাটা অনেকটা দৃষ্টিকটু। যেমন গত বছর পি সারা ওভালে নিজেদের শততম টেস্টে জয়ের পর এক কোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন বিসিবি সভাপতি। অথচ তখনো বাংলাদেশ দলের শ্রীলঙ্কা সফর শেষ হয়নি।

গত আগস্টে ঐতিহাসিক ঢাকা টেস্ট শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ঘোষণা এসেছিল ছয় কোটি টাকা বোনাসের। এর মধ্যে চার কোটি টাকা বাংলাদেশ পেয়েছিল আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সেমিফাইনাল খেলার সুবাদে, প্রাইজমানি হিসেবে। বাকী দুই কোটি টাকা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঢাকা টেস্ট জেতার উপহারস্বরূপ। এবার নিদাহাস ট্রফিতে বোনাস ঘোষণা করা হয়েছে ফাইনালের আগে।

বাংলাদেশ দল আইসিসির বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলার সুবাদে বিভিন্ন সময় বোনাস পায়। যেমন চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমি ফাইনালের জন্য চার কোটি টাকা পেয়েছিল।

বিসিবির কোষাগার থেকে বেশির ভাগ সময় চেক দেওয়া হয় খেলোয়াড়দের। বাংলাদেশ দল ভালো খেললে বিসিবি সভাপতি যে বোনাস ঘোষণা করেন, সেটি অবশ্য দ্রুতই পেয়ে যান খেলোয়াড়েরা।

খেলোয়াড়েরা বোনাস পান পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে, গ্রেডের ভিত্তিতে নয়। অনেক সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ( বিসিবি ) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বোর্ডের অনুমোদন বা পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজনও অনুভব করেন না বলে অভিযোগ আছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক বোর্ড পরিচালক প্রথম আলোকে বলেন, ‘খেলোয়াড়েরা বোনাস পেতে পারেন, তবে সেটি দেওয়া উচিত সঠিক পদ্ধতিতে,

‘যেভাবে বোনাস ঘোষণা করা হয়, এভাবে না দিয়ে ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগ প্রস্তাবনা আকারে বোর্ড মিটিংয়ে পাস করিয়ে নিতে পারে। না হলে মনে হতে পারে, বোনাস নির্ভর করে বোর্ড সভাপতির খুশি-অখুশির ওপর।

টাকার অঙ্ক যেহেতু নেহাত কম নয়, এ ধরনের আর্থিক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে পরিচালনা পর্ষদের মতামতের গুরুত্ব বা প্রতিফলন থাকা উচিত। হ্যাঁ, প্রেসিডেন্টের বোনাস ঘোষণার এখতিয়ার আছে।

কিন্তু তাঁর উচিত সহকর্মীদের যোগ্য সম্মান দেওয়া, যেহেতু তিনি আগে পরিচালক, পরে সভাপতি। আমরা সবাই চাই, খেলোয়াড়েরা আর্থিকভাবে লাভবান হোক। সবই হোক নির্দিষ্ট নীতিমালা মেনে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন,

‘ক্রিকেট বিশ্বে পাকিস্তান বোর্ড নিয়ে হাসাহাসি হয়। পিসিবিতেও কিন্তু এত হুটহাট বোনাস ঘোষণার সংস্কৃতি আমরা দেখি না। এ ছাড়া বাকি ক্রিকেট বিশ্বেও এভাবে বোনাস দেওয়ার খবর পাওয়া যায় না।

শ্রীলঙ্কা এই টুর্নামেন্টেই ভারতকে হারিয়েছে। এই টুর্নামেন্ট জেতা তাদের জন্য বেশি জরুরি ছিল। কই, শ্রীলঙ্কান বোর্ড তো ক্রিকেটারদের বাড়তি বোনাস ঘোষণা দিল না।’

তবে সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন মনে করেন, খেলোয়াড়দের প্রণোদনা দেওয়া খারাপ কিছু নয়। তবে তিনি পরামর্শ দিলেন প্রণোদনা দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবার। তাঁর মতে, বোনাসের চেয়ে খেলোয়াড়দের বেতনকাঠামো আরও বাড়ানোয় মনোযোগ দিতে পারে বিসিবি।

শুধু জাতীয় দল নয়, এর বাইরে থাকা সব স্তরের সব ক্রিকেটার যেন যোগ্যতার ভিত্তিতে সঠিক অঙ্কের পারিশ্রমিক পান, সেটি নিশ্চিত করা বেশি জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

জাতীয় দলের বাইরে চলে যাওয়া একজন ক্রিকেটার নিজের ফিটনেস ঠিকমতো ধরে রাখার মতো অবকাঠামোগত সুবিধাই সব সময় পান না। এগুলো ঠিক করা আরও বেশি জরুরি বলে মনে করেন সাবেক ক্রিকেটাররা।

জেলা পর্যায়ের একজন ক্রিকেটারও যেন পেশা হিসেবে ক্রিকেটকে সম্মানজনক মনে করেন, সেদিকেও উৎসাহ বাড়ানো জরুরি। বাংলাদেশের বিভাগীয় জেলাগুলোতেও ক্রিকেটের আধুনিক অবকাঠামোগত সুবিধা নেই।

গাজী আশরাফ হোসেন লিপু বলছেন,

‘এ ধরনের প্রণোদনা দেওয়ার বিপক্ষে নই। একজন ক্রিকেটারের খেলোয়াড়ি জীবন খুব দীর্ঘ নয়। শুধু জাতীয় দলের কেন, প্রণোদনা দেওয়া উচিত প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদেরও।

যেটি ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া দিয়ে থাকে। জিতলেই বছরে তিন-চার কোটি টাকার প্রণোদনা না দিয়ে এটা বেতনকাঠামোয় যোগ করলে আরও ভালো হয়। খেলোয়াড়েরা তাতে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হবে।’

নতুন বোনাস কাঠামো অনুযায়ী ক্রিকেটারদের নতুন বেতন কাঠামো –

‘এ’ প্লাস ক্যাটাগরি- ৪ লাখ টাকা (পূর্বে ছিল আড়াই লাখ টাকা)।
‘এ’ ক্যাটাগরি- ৩ লাখ টাকা (পূর্বে ছিল দুই লাখ টাকা)।
‘বি’ ক্যাটাগরি- ২ লাখ টাকা (পূর্বে ছিল দেড় লাখ টাকা)।
‘ডি’ ক্যাটাগরি- ১ লাখ টাকা (পূর্বে ছিল ৭৫ হাজার টাকা)।

এছাড়া গত বছর এপ্রিলে প্রস্তাবিত উইনিং বোনাসের পরিমাণ অনেকটা এমন-

আইসিসি টেস্ট র‍্যাংকিংয়ের ১-৩ নাম্বার দলকে হারাতে পারলে বোনাস পাবে ৪ হাজার ডলার (পূর্বে ছিল ৩ হাজার ডলার)।
আইসিসি টেস্ট র‍্যাংকিংয়ের ৪-৬ নাম্বার দলকে হারাতে পারলে বোনাস পাবে ৩ হাজার ডলার (পূর্বে ছিল ২ হাজার ডলার)।
আইসিসি টেস্ট র‍্যাংকিংয়ের শেষ তিন দলকে হারাতে পারলে বোনাস পাবে আড়াই হাজার ডলার (পূর্বে ছিল দেড় হাজার ডলার)।

আইসিসি ওয়ানডে র‍্যাংকিংয়ের ১-৩ নাম্বার দলকে হারাতে পারলে বোনাস পাবে আড়াই হাজার ডলার (পূর্বে ছিল দেড় হাজার ডলার)।
আইসিসি ওয়ানডে র‍্যাংকিংয়ের ৪-৬ নাম্বার দলকে হারাতে পারলে বোনাস পাবে দুই হাজার ডলার (পূর্বে ছিল এক হাজার ডলার)।
আইসিসি ওয়ানডে র‍্যাংকিংয়ের শেষ তিন দলকে হারাতে পারলে বোনাস পাবে এক হাজার ডলার (পূর্বে ছিল ৭০০ ডলার)।

অন্যদিকে, টি-টোয়েন্টিতে যে কোনো দলকে হারাতে পারলে বোনাস পাবে দেড় হাজার ডলার (পূর্বে ছিল এক হাজার ডলার)।

এছাড়া, ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় ও সিরিজ সেরা খেলোয়াড়রা পাবেন আলাদা বোনাস। পাশাপাশি তিন ফরম্যাটের অধিনায়ক প্রতি মাসে আলাদা করে পাবেন ২০ হাজার এবং সহ-অধিনায়ক ১০ হাজার টাকা।

বোনাস যে শুধু খেলোয়াড়কেই দিতে হবে, এমন নয়। গাজী আশরাফের যুক্তি, বোনাস দেওয়া যেতে পারে অনেকভাবে,

‘বোনাসের অনেক ধরন হতে পারে। যে খেলেছে তাকে দিতে পারে। সে যে জেলা থেকে উঠে এসেছে, সেখানকার ক্রিকেট উন্নয়নেও একটা আর্থিক সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। ধরুন,

মাশরাফি বিন মুর্তজা এসেছে নড়াইল থেকে। একটা সিরিজ বা টুর্নামেন্টে ভালো খেলার পুরস্কার হিসেবে বিসিবি নড়াইলের ক্রিকেট উন্নয়নে একটা আর্থিক সুবিধা দিতে পারে।’

উল্লেখ্য, বিসিবি বাংলাদেশের হাতেগোনা কয়েকটি স্বনির্ভর প্রতিষ্ঠানের একটি। গত কয়েক বছর ধরে পুরো ক্রিকেট বোর্ড পরিচালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ নিজস্ব আয় থেকে। শুধু তাই নয়, সরকারকে নির্ধারিত কর দেওয়ার পাশাপাশি ক্রিকেটার ও বোর্ড এগিয়ে আসছে বিভিন্ন চ্যারিটি কাজেও।