Friday , December 14 2018
Breaking News

বেরিয়ে এল নিহত আইনজীবীর স্ত্রী দীপার আরো গোপন তথ্য

স্ত্রীর পরকীয়ার জেরে খুন হন আইনজীবী রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনা। নিখোঁজ হওয়ার পাঁচ দিন পর স্ত্রীর দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মরদেহ উদ্ধার করে র‌্যাব।

রথীশের স্ত্রীর নাম স্নিগ্ধা সরকার দীপা ভৌমিক। তিনি রংপুরের তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। তার প্রেমিক কামরুল ইসলামও একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। ২৪ বছর আগে একই দিনে একই স্কুলে নিয়োগ পান এ দুজন।

র‌্যাব-১৩-এর অধিনায়ক আরমিন রাব্বি জানান, যে বাড়িতে রথীশের মরদেহ পাওয়া গেছে, তা দীপার সহকর্মী কামরুল ইসলামের ভাইয়ের বাড়ি। হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তারকৃত দীপা ও তার প্রেমিক এবং রথীশের সহকারী মিলন মোহন্তসহ ৯ জনকে গতকাল আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

পরপুরুষে আসক্ত দীপা: তদন্ত সংস্থাগুলোর সূত্র মতে, ১৯৯৪ সালের ৮ অক্টোবর একই দিনে ইসলাম ধর্মের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান কামরুল ইসলাম ও হিন্দু ধর্মের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান দীপা। তাদের নিয়োগ দিয়েছিলেন সেই সময়ে স্কুলের সহসভাপতি আইনজীবী রথীশ চন্দ্র ভৌমিক।

স্কুলে নিয়োগ পাওয়ার পরপরই কামরুলের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন দীপা। একই স্কুলের আরেক শিক্ষক মতিয়ার রহমান ও বাবু সোনার অফিস সহকারী মিলন মোহন্ত ছাড়াও আরো কয়েকজনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তবে কামরুলের সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টি ছিল ওপেন সিক্রেট।

পরপুরুষে আসক্ত ছিলেন দীপা। রথীশের সঙ্গে তার বিয়ের পর থেকেই পারিবারিক অশান্তি শুরু হয়। কামরুল ও দীপাকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে যুক্ত তদন্ত কর্মকর্তাদের সূত্র মতে, কামরুল দীপার কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

সূত্র মতে, স্কুল পরিচালনা কমিটির সেই সময়ের সভাপতি মারা যাওয়ার পর নতুন সভাপতি হন রথীশ চন্দ্র ভৌমিক। তখন তিনি শিক্ষক কামরুলের সব অবৈধ হস্তক্ষেপ কঠোরহস্তে দমন করেন। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্কুলে বহু উন্নয়ন করেছেন রথীশ।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী : বৃহস্পতিবার বিকেলে রংপুর অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন দীপা। এময় বাবু সোনার সহকারী ও দীপার ঘনিষ্ঠজন মিলন মোহন্তকেও আদালতে হাজির করা হয়।

যেভাবে খুন হন রথীশ: র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ বলেন, নিহতের দুই মাস আগেই রথীশ চন্দ্র ভৌমিককে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন অভিযুক্তরা। তবে নানা কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। পরে গত ২৯ মার্চ রাতে নিজ ঘরেই খুন করা হয় রথীশ চন্দ্রকে। রথীশের স্ত্রী দীপার সহায়তায় তার কথিত প্রেমিক কামরুল তাকে হত্যা করেন।

যে দিন খুন করা হয়, সে দিন রাতে ভাত ও দুধের সঙ্গে ১০টি ঘুমের বড়ি খাইয়ে রথীশ চন্দ্রকে অচেতন করেন দীপা। এরপর দীপা ও তার কথিত প্রেমিক কামরুল মিলে রথীশ চন্দ্রকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করেন। পরদিন খুব ভোরে কামরুল বাবুপাড়ার ভৌমিকের বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। পরে সকাল ৯টায় কামরুল একটি ভ্যান নিয়ে আবারো রথীশ চন্দ্রের বাড়িতে আসেন। এসময় দীপা তার স্বামীর লাশ আলমারির ভেতরে ঢুকিয়ে ভ্যানে করে নিয়ে যান কামরুলের ভাইয়ের মোল্লাপাড়ার নির্মাণাধীন একটি বাড়িতে। সেখানে আরো তিনজন মিলে লাশটি গর্ত করে মাটিচাপা দেয়।

র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, মাত্র ৩০০ টাকার বিনিময়ে তারা দুজন ছাত্রকেও এ কাজে ব্যবহার করেন। ছাত্ররা হলেন-মোল্লাপাড়ার রবিউল ইসলামের ছেলে সবুজ ইসলাম (১৭) ও একই এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে রোকনুজ্জামান (১৭)। তাদেরকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বেনজির আহমেদ জানান, কামরুল ইসলাম জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

গত শুক্রবার আইনজীবী রথীশের পরিবার থেকে জানানো হয়, তিনি বাবুপাড়া এলাকার বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। এরপরই তার সন্ধানে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর শনিবার রাতে নগরীর রাধাবল্লভের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় কামরুল ইসলামকে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হত্যাকাণ্ডের তথ্য বেরিয়ে আসে।

প্রসঙ্গত, রথীশ চন্দ্র জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি ও মাজারের খাদেম হত্যা মামলার সরকারি কৌঁসুলি ছিলেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এ টি এম আজহারুল ইসলামের মামলার সাক্ষী ছিলেন তিনি। রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদকও। এছাড়া জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক। হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট ও রংপুর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ছিলেন এই আইনজীবী।